• ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ১২ই শাওয়াল, ১৪৪৫ হিজরি

সিলেটে বিলাল-সিরাজ চক্রের খপ্পরে ফসলি জমির মাটি উজাড়

sylhetnewspaper.com
প্রকাশিত জানুয়ারি ১০, ২০২৪
সিলেটে বিলাল-সিরাজ চক্রের খপ্পরে ফসলি জমির মাটি উজাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না’- এমন সরকারি নির্দেশ থাকলেও সিলেটের সদর উপজেলার খাদিম নগর ও টুকের বাজার ইউনিয়নের একাধিক স্থানে বেআইনীভাবে ফসলি জমির মাটি কেটে উজাড় করছে একটি চক্র। ফসলি জমিকে পরিণত করা হচ্ছে গভীর পুকুরে।

এতে করে উপজেলায় আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষি জমির পরিমাণ। অভিযোগ রয়েছে এই চক্র স্থানীয় প্রশাসন ও ভুমি তহসিলদারদের ম্যানেজ করে একাধিক স্থানে টিলা ও ফসলি জমির মাটি কেটে উজাড়ের মহা-তান্ডব চালালেও অদৃশ্য কারণে এই চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ।

সরজমিনে সোমবার (০৮ ডিসেম্বর) বেলা ১১ ঘটিকায় দেখা যায়- টুকেরবাজার ইউনিয়নের চাতল, কামার টিলা, নয়াবিল, শান্তিপুর ও খাদিম নগর ইউনিয়নের বাইশটিল্লায় সরকারি খাস জমি ও ফসলি জমিতে প্রকাশ্যে এক্সকেভেটর মেশিন লাগিয়ে চলছে মাটি কাটার মহা-তান্ডব। আর মাটি ড্রাম ট্রাক যোগে স্থানান্তর করা হচ্ছে বিভিন্ন ইট ভাটাসহ অন্যত্র স্থানে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান- ভাটা গ্রামের তাজ উল্লার পুত্র বিলাল ও কামার টিলা গ্রামের মছদ্দর আলীর পুত্র সিরাজ মিয়ার নেতৃত্বেই এমন মহা-তান্ডব লীলা চলছে। এক কথায় এ দুই ইউনিয়নের ফসলি জমির মাটি কেটে উজাড় করা হচ্ছে বিলাল-সিরাজের শেল্টারেই। এ দুই ইউনিয়নের ভূমিখেকো চক্রের নিয়ন্ত্রক বিলাল-সিরাজ।

অভিযোগ প্রকাশ, বিগত সময়ে এ দুই ইউনিয়নের টিলা ও ফসলি জমি রক্ষায় সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করলেও থামানো যাচ্ছে না বিলাল-সিরাজ চক্রকে। এই বিলাল-সিরাজ সহ চক্রের একাধিক ব্যক্তিকে সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর জেল-জরিমানা করলেও তারা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বাহির হয়েই ফের চালায় পরিবেশ ধ্বংসের মতো এমন ধ্বংস লীলা। পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট জেলা অফিসের একটি সুত্র জানায় এই বিলাল-সিরাজ সহ তাদের চক্রের বহু ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মাটি কাটার অপরাধে পরিবেশ আইনে অগনিত মামলা মোকদ্দমা হয়েছে।

এদিকে, একই ইউনিয়নের চাতল গ্রামের কালা মিয়ার পুত্র আনোয়ার হোসেন অভিযোগ করে বলেন- টুকের বাজার ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের শান্তিপুর গ্রামের চাতল মৌজার ১০০৮ নং দাগের ৩০ একর ফসলি জমি ৩ বছরের জন্য সরকার থেকে লিজ নিয়েছেন তিনি। তার লিজকৃত ফসলি জমির কয়েকটি স্থানে জোরপূর্বক এক্সকেভেটর মেশিন লাগিয়ে ৫-৮ ফুট গর্ত করে মাটি কেটে নিচ্ছে বিলাল-সিরাজ চক্র। ফসলি জমি রক্ষায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও অদৃশ্য কারণে বিলাল-সিরাজ চক্রের বিরুদ্ধে যথাযথ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি এয়ারপোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বলে অভিযোগ করেন আনোয়ার। থানাপুলিশের এমন নিরব ভূমিকায় নিরুপায় হয়ে সিলেট সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসারের বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।

এমন অভিযোগ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন সিলেট সদরের সহকারী কমিশনার-কে (ভূমি)। তবে এই অভিযোগটি হাতে পেয়ে সিলেট সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করে উত্তরকাছ ইউনিয়নের ভূমি অফিসের উপ-সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) অনিল কুমার সিংহকে সরজমিন তদন্ত করে লিখিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন তিনি। উপ-সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) অনিল কুমার সিংহকে সরজমিন ঘটনাস্থলে তদন্তকালে একাধিক লোকজনের সম্মুখে স্থানীয় একজন সংবাদকর্মী পাশের একটি ফসলি জমিতে এক্সকেভেটর মেশিন লাগিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে মর্মে খবর দিলে তিনি প্রথমে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তার নিকট জানতে চান কে বা কারা সেখানে মাটি কাটছে? জবাবে ঐ সংবাদকর্মী তাকে জানায় যে বিলাল-সিরাজ চক্র সেখানে এক্সকেভেটর মেশিন লাগিয়ে মাটি কেটে মাটি অন্যত্র বিক্রি করছে কিন্তু তাদের নাম শুনেই যেনও ধমকে গেলেন তিনি জানালেন পরবর্তীতে কোন এক সময় এসে দেখবেন। তার এমন আচরণে সেখানে উপস্থিত মানুষের মনে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে মাটি খেকো বিলাল-সিরাজ চক্রের সঙ্গে উপ-সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) অনিল কুমার সিংহের কি কোন গভীর সংখ্যতা রয়েছে কি না? না কি ফসলি জমির মাটি বিক্রির ভাগ বাটোয়ারাও তিনি পাচ্ছেন এই চক্রের নিকট থেকে?

তদন্ত শেষে এব্যাপারে জানতে চাইলে ঘটনাস্থলেই ঐ সংবাদকর্মীকে উপ-সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) অনিল কুমার সিংহ জানান- মাটি কাটার সত্যতা পাওয়া গেছে, আমি তদন্ত প্রতিবেদন আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিবো আর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যা নেওয়ার উনারাই নিবেন।

এব্যাপারে বিলাল-এর ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফসলি জমির মাটি কাটার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান- আমাদের মালিকানা উঁচু জায়গার মাটি কেটে আমরা নিচ্ছি। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি আছে কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন পরে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।

এব্যাপারে সিরাজ মিয়ার ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফসলি জমির মাটি কাটার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান- ব্যবসা ত আমরা একা করি না বহুত লোক ব্যবসা করে, আমাদের এলাকার মেম্বারও মাটির ব্যবসা করেন। আমি ত টুকটাক মাটির ব্যবসা করি, এক জমি থেকে আরেক জমিতে মাটি ফেলি। তিনিও পরবর্তীতে প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বলে জানান।

এব্যাপারে এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নুনু মিয়ার সরকারি সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- মাটি কাটার বিষয়ে কোন অভিযোগ পাননি তবে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এব্যাপারে উপজেলা ভূমি অফিস, সিলেট সদর, সিলেটের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা জাহান সরকার-এর সরকারি সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- ফসলি জমির মাটি কাটার বিষয় প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এব্যাপারে সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাছরীন আক্তার-এর সরকারি সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- তদন্ত সাপেক্ষে ফসলি জমির মাটি কাটার সত্যতা পাওয়া গেছে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এব্যাপারে সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক এমরান হোসেন-এর সরকারি সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- ফসলি জমির মাটি কেটে কেউ ইটভাটায় নিলে পরিবেশ অধিদপ্তর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। তবে এর বাহিরে কোন কিছু হলে সেটা স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ব্যবস্থা নিতে পারেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •